প্যাঙ্গোলিন: পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি পাচার হওয়া স্তন্যপায়ী প্রাণী

প্যাঙ্গোলিন, যাকে বাংলায় সাধারণত “আঁশযুক্ত উইপোকাখেকো” বলা হয়, পৃথিবীর অন্যতম বিস্ময়কর স্তন্যপায়ী প্রাণী। পুরো শরীর শক্ত আঁশে ঢাকা এই প্রাণী বিপদের মুখে নিজেকে বলের মতো গুটিয়ে ফেলে। কিন্তু এই প্রাকৃতিক বর্মও তাদের অবৈধ শিকার থেকে রক্ষা করতে পারছে না। প্যাঙ্গোলিনকে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পাচার হওয়া বন্য স্তন্যপায়ী প্রাণী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

পৃথিবীতে প্যাঙ্গোলিনের আটটি প্রজাতি রয়েছে; চারটি এশিয়ায় এবং চারটি আফ্রিকায় বাস করে। এরা মূলত দিনের বেলা লুকিয়ে থাকে এবং রাতে উইপোকা ও পিঁপড়া খায়। একটি প্যাঙ্গোলিন দিনে প্রচুর পরিমাণে পিঁপড়া ও উইপোকা খেতে পারে, ফলে বাস্তুতন্ত্রে পোকামাকড়ের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে এদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

প্যাঙ্গোলিনের আঁশ কেরাটিন নামক প্রোটিন দিয়ে তৈরি, যা মানুষের নখ ও চুলের মূল উপাদানের মতো। তবুও কিছু অঞ্চলে এই আঁশ ঐতিহ্যবাহী ওষুধের উপাদান হিসেবে চাহিদা পায়, যদিও এর চিকিৎসাগত কার্যকারিতার বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। এছাড়া মাংসের চাহিদাও অবৈধ শিকারের অন্যতম কারণ।

অবৈধ বাণিজ্যের বিস্তার ভয়াবহ। মার্কিন ফিশ অ্যান্ড ওয়াইল্ডলাইফ সার্ভিসের তথ্যে বলা হয়েছে, ২০০০ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে জব্দের তথ্যের ভিত্তিতে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৮ লাখ ৯৫ হাজারের বেশি প্যাঙ্গোলিন পাচার হয়েছে বলে অনুমান করা হয়। আবার কিছু গবেষণায় ২০০০–২০১৯ সময়ে প্রায় ১০ লাখ প্যাঙ্গোলিন পাচারের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

এশিয়ার প্রজাতিগুলোর সংখ্যা দ্রুত কমে যাওয়ায় পাচারকারীরা এখন মূলত আফ্রিকা থেকে প্যাঙ্গোলিন সংগ্রহ করে এশীয় বাজারে পাঠাচ্ছে। ফলে আফ্রিকার প্রজাতিগুলোও ক্রমেই বিপদের মুখে পড়ছে। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘ বা আইইউসিএন-এর লাল তালিকা অনুযায়ী আটটি প্রজাতির সবগুলোই হুমকির সম্মুখীন; এর মধ্যে চীনা, ফিলিপাইনি ও সুন্দা প্যাঙ্গোলিন সমালোচনামূলকভাবে বিপন্ন।

আন্তর্জাতিকভাবে প্যাঙ্গোলিন রক্ষার জন্য ২০১৭ সাল থেকে সব প্রজাতিকে সাইটেস চুক্তির পরিশিষ্ট-১-এ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর অর্থ, প্যাঙ্গোলিন ও তার আঁশ, মাংস বা শরীরের কোনো অংশের বাণিজ্যিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তবুও অবৈধ শিকার ও পাচার অব্যাহত রয়েছে, যা এই প্রজাতির টিকে থাকার প্রধান হুমকি।

প্যাঙ্গোলিন রক্ষায় প্রয়োজন কঠোর আইন প্রয়োগ, পাচারের রুট বন্ধ করা, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বন্যপ্রাণী পণ্যের চাহিদা কমানো। প্রকৃতির এই নীরব রক্ষককে বাঁচাতে পারলে কেবল একটি প্রজাতি নয়, বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্যও রক্ষা পাবে।

Follow For More