ঢাকার অদূরে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে একটি সরু সড়কের দুই পাশে সারি সারি পুরোনো দালান দাঁড়িয়ে আছে। কোথাও খিলান, কোথাও ভাঙা বারান্দা, আর চারদিকে নীরবতা। এটিই পানাম নগর, যেখানে একসময় সমৃদ্ধ বণিকেরা বসবাস করতেন।
মধ্যযুগে সোনারগাঁও ছিল পূর্ব বাংলার প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র। ইবনে বতুতা, মা হুয়ান, নিকোলো দে কন্তি ও র্যালফ ফিচের মতো পর্যটকেরা একে সমৃদ্ধ বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সপ্তদশ শতকের প্রথম দিকে ঢাকা সুবা বাংলার রাজধানী হলে সোনারগাঁওয়ের প্রশাসনিক গুরুত্ব কমতে থাকে।
ঊনবিংশ শতক থেকে বিংশ শতকের শুরুর দিকে কাপড়ের ব্যবসায়ী ধনী বণিকেরা পানামে বাড়ি নির্মাণ করেন। প্রায় ৬০০ মিটার দীর্ঘ ও ৫ মিটার চওড়া একটি সড়কের দুই পাশে গড়ে ওঠে এই নগর।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সড়কের উত্তরে ৩১টি ও দক্ষিণে ২১টি, মোট ৫২টি ভবন এখনো টিকে আছে। স্থাপত্যে ইউরোপীয় ও মুঘল রীতির মিশ্রণ দেখা যায়। প্রায় প্রতিটি বাড়িতে কূপ ছিল, আর পানির জোগানের জন্য দুই পাশে ছিল খাল ও পুকুর। বসতবাড়ির পাশাপাশি এখানে উপাসনালয়, স্নানঘর, পান্থশালা ও আদালতকক্ষও ছিল। ভবনগুলো ছোট লাল ইটে তৈরি, কোনোটি প্লাস্টার করা, কোনোটির ইট খোলা। অনেক ভবন সাজানো হয়েছিল রঙিন মোজাইকে।
দেশভাগ ও তার পরবর্তী অস্থির সময়ে, বিশেষ করে ১৯৪৭ ও ১৯৬৫ সালের পর, অনেক বাসিন্দা নগর ছেড়ে চলে যান। এরপর ভবনগুলো অযত্নে পড়ে থাকে। সূত্রভেদে সময়ের হিসাব কিছুটা আলাদা হলেও ফল একই: প্রাণচঞ্চল জনপদ ধীরে ধীরে নীরব হয়ে যায়। পরে ভবনগুলো অবৈধ দখলের শিকার হয়, আর স্যাঁতসেঁতে ভাব ও পোকামাকড়ের কারণে ক্ষতি বাড়ে।
২০০৩ সালে সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করে পানাম নগরকে সংরক্ষিত প্রত্নস্থান ঘোষণা করে। ২০০৬ সালে নিউইয়র্কভিত্তিক ওয়ার্ল্ড মনুমেন্টস ফান্ড একে বিশ্বের ১০০টি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ঐতিহ্যস্থানের তালিকায় রাখে। পরে ১৩ নম্বর ভবনে পরীক্ষামূলক সংস্কারের মধ্য দিয়ে সংরক্ষণের কাজ শুরু হয়।
আজ পানাম নগর বাংলার বাণিজ্য, স্থাপত্য ও নগরজীবনের এক নীরব সাক্ষী। সময় থেমে থাকা এই পথে হাঁটলে বোঝা যায়, একটি সমৃদ্ধ জনপদ হারিয়ে গেলে কী থেকে যায়, আর কেন তা রক্ষা করা জরুরি।