২০২৮ সালে আন্তঃনক্ষত্র অভিযানের পরিকল্পনা, প্রক্সিমা সেন্টরিতে পৌঁছাতে লাগবে ৮০ হাজার বছর

মানবজাতির প্রথম আন্তঃনক্ষত্র অভিযানের স্বপ্ন বাস্তবায়নে ‘ফার্মি এক্সপ্লোরার’ নামে একটি মহাকাশ মিশনের পরিকল্পনা করছেন বিজ্ঞানীরা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৮ সালে মহাকাশযানটি পৃথিবী থেকে প্রক্সিমা সেন্টরির উদ্দেশে যাত্রা শুরু করতে পারে। তবে গন্তব্যে পৌঁছাতে সময় লাগবে প্রায় ৮০ হাজার বছর।

পৃথিবী থেকে প্রায় ৪ দশমিক ৪ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত প্রক্সিমা সেন্টরি সৌরজগতের নিকটতম নক্ষত্রগুলোর একটি। মহাকাশযানটিকে সেখানে পৌঁছাতে প্রায় ২৫ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন মাইল পাড়ি দিতে হবে। ফলে এই অভিযানের চূড়ান্ত পরিণতি দেখার সুযোগ বর্তমান প্রজন্মের কারও হবে না।

স্পেনের টেনেরিফে আয়োজিত ‘স্টারমাস ফেস্টিভ্যাল’-এ মিশনটির পরিকল্পনা তুলে ধরেন উদ্যোক্তা কাম গাফফারিয়ান। তাঁর মতে, চাঁদে পৌঁছানো মানবজাতির মহাকাশযাত্রার শেষ লক্ষ্য নয়; বরং এটি সৌরজগতের বাইরের অভিযানের প্রস্তুতি। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আন্তঃনক্ষত্র ভ্রমণে অনুপ্রাণিত করাই এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৪৩ সালের দিকে ফার্মি এক্সপ্লোরার সৌরজগতের সীমানা অতিক্রম করতে পারে। তবে নক্ষত্রটিতে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লাগবে। মহাকাশযানটির যাত্রাপথ নির্ধারণের ক্ষেত্রে আলফা সেন্টারি নক্ষত্রব্যবস্থার ভবিষ্যৎ অবস্থান বিবেচনায় নেওয়া হবে, কারণ এত দীর্ঘ সময়ে নক্ষত্রগুলোর অবস্থান পরিবর্তিত হবে।

মহাকাশযানে থাকবে পৃথিবীর বার্তা

ভয়েজার মহাকাশযানের আদলে ফার্মি এক্সপ্লোরারেও ‘গোল্ডেন রেকর্ড’-এর একটি অনুলিপি রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে থাকবে পৃথিবীর উদ্ভিদ ও প্রাণীর ছবি, গাণিতিক সূত্র, ৫৫টি ভাষায় শুভেচ্ছাবার্তা, গান, পাখির ডাক এবং মানুষের হাসি ও পদশব্দের মতো নানা শব্দ। এ ছাড়া সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের লিখিত বার্তা এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের শিশুদের নতুন বার্তা যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।

মিশনটির উদ্যোক্তারা মনে করেন, এটি শুধু বৈজ্ঞানিক অভিযান নয়; বরং মানবসভ্যতার ইতিহাস ও অর্জন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি উদ্যোগ।

অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ

মিশনটি বাস্তবায়নে ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে উদ্যোক্তাদের দল। মহাকাশযানে ব্যবহারের জন্য বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ও শিল্পকর্মের প্রস্তাবও আহ্বান করা হয়েছে। বিবেচনায় রয়েছে মহাজাগতিক ধূলিকণা সংগ্রহের অ্যারোজেল টাইল, ক্ষুদ্র উল্কাপিণ্ডের আঘাত শনাক্তের যন্ত্র এবং একটি রেডিওআইসোটোপ ঘড়ি।

তবে এই অভিযানের বড় সীমাবদ্ধতা হলো যোগাযোগব্যবস্থা। মহাকাশযানটিতে ছোট অ্যান্টেনা থাকায় সৌরজগতের সীমানা পেরিয়ে যাওয়ার পর এর সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা সম্ভব হবে না বলে জানিয়েছে পরিকল্পনাকারীরা। দীর্ঘ সময় পরও এর যন্ত্রপাতি থেকে তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত সীমিত।

মিশনটির সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রেসিডেন্ট ফিলিপ জনস্টনের মতে, এর মূল উদ্দেশ্য শুধু গন্তব্যে পৌঁছানো নয়; বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিজেদের সময়ের সীমাবদ্ধতা ছাড়িয়ে নতুন কিছু অর্জনের স্বপ্ন দেখানো।

উদ্যোক্তাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় রয়েছে অ্যান্ড্রোমিডা গ্যালাক্সির দিকেও মহাকাশযান পাঠানো। তাঁদের হিসাব অনুযায়ী, মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি পেরিয়ে অন্য একটি গ্যালাক্সিতে পৌঁছাতে প্রায় এক বিলিয়ন বছর লাগতে পারে।

এখন পর্যন্ত কোনো মহাকাশযানকে অন্য একটি নক্ষত্রে পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়নি। তবে পদার্থবিদ স্টিফেন হকিংয়ের সমর্থন পাওয়া ‘ব্রেকথ্রু স্টারশট’ প্রকল্পে আলোর রশ্মির সাহায্যে ক্ষুদ্র মহাকাশযান আলফা সেন্টারিতে পাঠানোর প্রস্তাব রয়েছে।

ফার্মি এক্সপ্লোরার এখনো পরিকল্পনাধীন একটি উদ্যোগ। বাস্তবায়িত হলে এটি মানবজাতির মহাকাশ অনুসন্ধানের ইতিহাসে দীর্ঘমেয়াদি আন্তঃনক্ষত্র অভিযানের একটি প্রতীকী পদক্ষেপ হয়ে উঠতে পারে।