জাপানে এমন একটি ঐতিহ্যবাহী উৎসব রয়েছে, যেখানে শিশুদের কান্নাকে অশুভ শক্তি দূর করা এবং সুস্বাস্থ্য ও সৌভাগ্য বয়ে আনার প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ‘নাকি সুমো’ (Naki Sumo) বা ‘নাকিজুমো’ নামে পরিচিত এই উৎসবে পেশাদার সুমো কুস্তিগিরদের কোলে বসিয়ে শিশুদের কান্নার প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ানো হয়।
উৎসবটি সাধারণত জাপানের বিভিন্ন বৌদ্ধ মন্দির ও শিন্তো উপাসনালয়ে আয়োজন করা হয়। এ সময় অভিভাবকেরা তাঁদের শিশুদের নিয়ে অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন। এরপর দুই সুমো কুস্তিগির একটি ঐতিহ্যবাহী কুস্তির মঞ্চে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে শিশুদের কোলে নেন। তাঁদের পাশাপাশি বিচারক ও সহকারীরাও শিশুদের প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেন।
শিশুদের কান্নায় উৎসাহিত করতে কখনো ভীতিকর মুখোশ পরা হয়, কখনো অদ্ভুত মুখভঙ্গি করা হয়, আবার কখনো উচ্চস্বরে ডাকা হয়। অনেক আয়োজনেই যে শিশু প্রথমে কাঁদে অথবা সবচেয়ে জোরে কাঁদতে পারে, তাকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। তবে স্থানভেদে প্রতিযোগিতার নিয়মে কিছুটা পার্থক্য দেখা যায়।
বাইরে থেকে বিষয়টি অস্বাভাবিক মনে হলেও জাপানের এই ঐতিহ্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের লোকবিশ্বাস। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, শিশুর জোরে কান্না তার সুস্বাস্থ্য ও শক্তিমত্তার লক্ষণ। একই সঙ্গে বিশ্বাস করা হয়, এই কান্না অশুভ শক্তিকে দূরে সরিয়ে শিশুকে অসুস্থতা ও দুর্ভাগ্য থেকে রক্ষা করতে সহায়তা করে।
তবে উৎসবটির উদ্দেশ্য শিশুদের ভয় দেখানো বা কষ্ট দেওয়া নয়। বরং পরিবারের সদস্যরা তাঁদের সন্তানের সুস্থ ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ কামনায় এই আয়োজনে অংশ নেন। জাপানের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত এই অনুষ্ঠানটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে টিকে রয়েছে।
আধুনিক সময়ে এমন ব্যতিক্রমী আয়োজন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের কাছেও কৌতূহলের বিষয় হয়ে উঠেছে। জাপানের ‘নাকি সুমো’ তাই শুধু কান্নার প্রতিযোগিতা নয়; বরং শিশুদের মঙ্গল কামনায় গড়ে ওঠা একটি স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য।
উৎসবের আয়োজন জাপানের বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্নভাবে অনুষ্ঠিত হয়। কোথাও এটি স্থানীয় ধর্মীয় অনুষ্ঠানের অংশ, আবার কোথাও শিশুদের নিয়ে পরিবারের বিশেষ অংশগ্রহণমূলক আয়োজন হিসেবে পালিত হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ঐতিহ্য জাপানের সংস্কৃতির একটি পরিচিত অংশে পরিণত হয়েছে, যা দেশটির প্রাচীন বিশ্বাস ও পারিবারিক মূল্যবোধের পরিচয় বহন করে।
Follow For More