বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা সম্প্রসারিত হলেও ডিগ্রিধারীদের জন্য উপযুক্ত চাকরি তৈরি হচ্ছে না। ফলে লাখো শিক্ষিত তরুণ ডিগ্রি হাতে নিয়েও দীর্ঘদিন কর্মহীন থাকছেন বা শিক্ষাগত যোগ্যতার সঙ্গে সম্পর্কহীন কাজে যুক্ত হচ্ছেন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী, দেশে মোট বেকার প্রায় ২৬ লাখ ২০ হাজার; এর মধ্যে উচ্চশিক্ষিত বা বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রিধারী বেকার প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজার। অর্থাৎ দেশের মোট বেকারের একটি বড় অংশই এখন ডিগ্রিধারী।
প্রতি বছর প্রায় ৭ লাখ নতুন স্নাতক কর্মবাজারে প্রবেশ করছেন, কিন্তু নতুন চাকরি তৈরি হচ্ছে প্রায় ৩ লাখ। ফলে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ফাঁক তৈরি হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রিধারীদের বেকারত্বের হার প্রায় ১৩.৫ শতাংশ, যা সব শিক্ষাগত স্তরের মধ্যে সর্বোচ্চ। একই সময়ে বেকারদের প্রতি তিনজনের একজনই বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক, যা কর্মবাজারের সংকুচিত হওয়ার স্পষ্ট সংকেত।
শুধু চাকরির সংখ্যা কম তা নয়; অনেক নিয়োগকর্তা বলছেন, তাঁরা যোগ্য দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীও খুঁজে পাচ্ছেন না। আধুনিক কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজন হয় সমস্যা সমাধান, ডিজিটাল দক্ষতা, যোগাযোগ, দলগত কাজ ও বাস্তব অভিজ্ঞতা—কিন্তু অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনো মূলত তত্ত্বনির্ভর ও মুখস্থনির্ভর শিক্ষার ওপর জোর দিচ্ছে।
একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, নিয়োগকর্তারা বিশ্লেষণী চিন্তা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, সমালোচনামূলক চিন্তা এবং আন্তঃব্যক্তিক দক্ষতায় গড়ে ৬০.৭৮ শতাংশ ঘাটতি চিহ্নিত করেছেন। এতে বোঝা যায়, ডিগ্রি থাকা মানেই চাকরির জন্য প্রস্তুত থাকা নয়।
অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম শিল্পের বর্তমান চাহিদার সঙ্গে যথেষ্ট সংযুক্ত নয়। ইন্টার্নশিপ, বাস্তব প্রকল্প, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও শিল্প-সংযোগের সুযোগ কম থাকায় শিক্ষার্থীরা সার্টিফিকেট পেলেও কর্মক্ষেত্রের বাস্তবতার জন্য প্রস্তুত হন না।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিআইডিএস) একটি গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চ জিপিএ থাকা সরাসরি চাকরি পাওয়ার নিশ্চয়তা দেয় না; বরং ইন্টার্নশিপ ও কাজের অভিজ্ঞতা কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা বাড়ায়।
কী করা যায়
* বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে ডিজিটাল দক্ষতা, ডেটা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, যোগাযোগ ও সমস্যা সমাধানকে বাধ্যতামূলক করা।
* শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ইন্টার্নশিপ, অ্যাপ্রেন্টিসশিপ ও যৌথ প্রকল্পের সুযোগ বাড়ানো।
* কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে আধুনিক করে তোলা এবং বাজারচাহিদা অনুযায়ী কোর্স হালনাগাদ করা।
* উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য প্রশিক্ষণ, ঋণ সহায়তা ও স্টার্টআপ বাস্তবায়নের পরিবেশ তৈরি করা।
* চাকরিপ্রার্থীদের সিভি, ইংরেজি যোগাযোগ, সাক্ষাৎকার এবং পেশাদার নেটওয়ার্কিং দক্ষতা উন্নয়নে সহায়তা দেওয়া।
শিক্ষিত তরুণদের সংকট শুধু ব্যক্তিগত হতাশার বিষয় নয়; এটি দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনারও অপচয়। ডিগ্রি ও কর্মবাজারের মধ্যে সেতু তৈরি না হলে জনসংখ্যাতাত্ত্বিক সুবিধা কাজে লাগানো কঠিন হবে।
Follow For More