জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে ইউরোপের ৪৩ শতাংশ বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শুধু পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও অর্থনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; ক্রমেই হুমকির মুখে পড়ছে বিশ্বের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও। চরম আবহাওয়া, বন্যা, তাপপ্রবাহ এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে ইউরোপের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থাপনা, জাদুঘর ও মূল্যবান শিল্পকর্ম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

এক গবেষণার হিসাব অনুযায়ী, ইউরোপে ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলোর প্রায় ৪৩ শতাংশ বর্তমানে চরম আবহাওয়া, বন্যা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। EDHEC Climate Institute-এর জলবায়ু ঝুঁকি মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং ইউনেসকোর ভৌগোলিক তথ্যভান্ডার ব্যবহার করে এই হিসাব করা হয়েছে।

গবেষকদের মতে, এই ঝুঁকি শুধু ভেনিসের মতো বিখ্যাত শহর বা ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন গির্জা, গ্রন্থাগার, স্থানীয় সংগ্রহশালা ও ছোট জাদুঘরে সংরক্ষিত ঐতিহাসিক নিদর্শনও এর আওতায় রয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অতিরিক্ত আর্দ্রতা, তাপমাত্রার ওঠানামা এবং বন্যার ফলে চিত্রকর্ম ও দেয়ালচিত্রে ছত্রাক জন্মাতে পারে। পাশাপাশি তাপপ্রবাহ ও পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে বিভিন্ন ঐতিহাসিক উপকরণের স্থায়িত্ব নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের একটি জরিপে দেখা গেছে, দেশটির ৩৫ শতাংশ আর্ট মিউজিয়ামের পরিচালক জানিয়েছেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। অন্যদিকে, ৫০ শতাংশ প্রতিষ্ঠান এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

ঝুঁকি মোকাবিলায় ফ্রান্সের লুভর জাদুঘরও পদক্ষেপ নিয়েছে। বন্যার আশঙ্কা থেকে জাতীয় সংগ্রহশালার প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার শিল্পকর্ম পা-দ্য-কালে অঞ্চলের লিভাঁ কনজারভেশন সেন্টারে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এদিকে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পড়ছে সংগীত ঐতিহ্যেও। ইতালির ডোলোমাইটস অঞ্চলের ভাল দি ফিয়েম্মে এলাকার স্প্রুস কাঠ, যা ঐতিহাসিকভাবে স্ট্রাডিভারিয়াস বেহালা তৈরিতে ব্যবহৃত হতো, তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও ক্ষতিকর পোকামাকড়ের বিস্তারে হুমকির মুখে রয়েছে।

গবেষণার অর্থনৈতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২১০০ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মাদ্রিদের আঞ্চলিক উৎপাদন ৩২ শতাংশ এবং রোমের ৪১ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। একই সময়ে ভিয়েনায় ১৩ শতাংশ এবং বার্লিনে ১৮ শতাংশ ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

গবেষকদের মতে, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য কেবল পুরোনো স্থাপনা বা শিল্পকর্ম নয়; এগুলো একটি জাতির ইতিহাস, পরিচয় ও সম্মিলিত স্মৃতির অংশ। একবার ধ্বংস হয়ে গেলে অনেক ঐতিহাসিক নিদর্শন আর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
Follow For More