এক জায়গায় নয়, বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগে গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা

আয় থেকে সঞ্চয় গড়ে তোলার পর সেই অর্থ কোথায় এবং কীভাবে বিনিয়োগ করা হবে, তা নিয়ে অনেকেই দ্বিধায় থাকেন। সঠিক পরিকল্পনার অভাবে প্রত্যাশিত মুনাফা না পাওয়ার পাশাপাশি মূলধন হারানোর ঝুঁকিতেও পড়তে পারেন বিনিয়োগকারীরা। এ পরিস্থিতিতে বিনিয়োগের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বিভিন্ন সম্পদশ্রেণিতে অর্থ ভাগ করে রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সবার জন্য প্রযোজ্য কোনো নির্দিষ্ট অনুপাত নেই। বরং বিনিয়োগকারীর আর্থিক লক্ষ্য, অর্থের প্রয়োজনীয়তা, বিনিয়োগের সময়সীমা এবং ঝুঁকি নেওয়ার সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে পোর্টফোলিও সাজানো উচিত।

স্বল্পমেয়াদি সঞ্চয়ে আমানত, দীর্ঘমেয়াদে বিকল্প

যাদের হাতে এক লাখ টাকার মতো অর্থ রয়েছে এবং স্বল্প সময়ের মধ্যে তা প্রয়োজন হতে পারে, তাদের জন্য স্বল্পমেয়াদি ব্যাংক আমানত একটি বিবেচ্য বিকল্প। অন্যদিকে, তিন থেকে পাঁচ বছর বা তার বেশি সময় অর্থ ব্যবহারের প্রয়োজন না হলে সঞ্চয়পত্রসহ অন্যান্য বিনিয়োগ মাধ্যম বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে বিনিয়োগের আগে প্রতিটি মাধ্যমের বর্তমান মুনাফার হার, কর, মেয়াদপূর্তির শর্ত এবং আগাম অর্থ উত্তোলনের নিয়ম যাচাই করা জরুরি।

বড় অঙ্কের সঞ্চয়ের ক্ষেত্রেও সব অর্থ এক ধরনের বিনিয়োগে না রেখে বিভিন্ন মাধ্যমে ভাগ করে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। উদাহরণ হিসেবে, এক কোটি টাকার একটি কাল্পনিক পোর্টফোলিওতে ৫০ লাখ টাকা সঞ্চয়পত্রে, ৪০ লাখ টাকা ট্রেজারি বন্ড বা সরকারি সুকুকে এবং বাকি ১০ লাখ টাকা ব্যাংকের স্থায়ী আমানতে রাখা যেতে পারে। এটি একটি উদাহরণমাত্র; সবার জন্য একই বিনিয়োগ অনুপাত উপযুক্ত নয়।

মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের সুযোগ

সরকারি সিকিউরিটিজে সরাসরি বিনিয়োগের প্রক্রিয়া জটিল মনে হলে ওপেন-এন্ডেড মিউচুয়াল ফান্ড আরেকটি বিকল্প হতে পারে। এসব ফান্ডে বিভিন্ন বিনিয়োগকারীর অর্থ একত্র করে পেশাদার ফান্ড ম্যানেজাররা নির্ধারিত নীতিমালা অনুযায়ী বিভিন্ন আর্থিক উপকরণে বিনিয়োগ করেন। এর মধ্যে বন্ড, সুকুক এবং ফান্ডের ধরন অনুযায়ী শেয়ারও থাকতে পারে।

বাংলাদেশে বিভিন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান মিউচুয়াল ফান্ড পরিচালনা করে। তবে সব ফান্ডের ঝুঁকি ও সম্ভাব্য রিটার্ন এক নয়। বিনিয়োগের আগে ফান্ডের বিনিয়োগনীতি, ব্যবস্থাপনা ফি, অতীতের কার্যক্রম এবং অর্থ ফেরত পাওয়ার শর্ত যাচাই করা প্রয়োজন। অতীতের মুনাফা ভবিষ্যতের রিটার্ন নিশ্চিত করে না।

যারা তুলনামূলক বেশি রিটার্নের আশায় কিছুটা ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত, তারা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের ফান্ড বিবেচনা করতে পারেন। শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগের জন্যও নির্দিষ্ট কিছু ফান্ড রয়েছে। তবে কোনো বিনিয়োগ মাধ্যমকেই সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত ধরে নেওয়া উচিত নয়।

দ্রুত মুনাফার প্রত্যাশা বাড়াতে পারে ঝুঁকি

স্বল্প সময়ে অর্থ দ্বিগুণ বা তিনগুণ করার প্রত্যাশা বিনিয়োগকারীদের ভুল সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিতে পারে। বিশেষ করে পর্যাপ্ত আর্থিক বিশ্লেষণ ও বাজার সম্পর্কে ধারণা ছাড়া সরাসরি শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করলে লোকসানের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। পেশাদার ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত মিউচুয়াল ফান্ড একটি বিকল্প হলেও সেখানেও মূলধন কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

জমিতে বিনিয়োগ থেকেও মুনাফার সুযোগ থাকতে পারে। তবে জমি দ্রুত নগদ অর্থে রূপান্তর করা কঠিন হতে পারে এবং মালিকানা, কাগজপত্র ও বাজারদরের মতো বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ।

সব মিলিয়ে, বিনিয়োগের আগে জরুরি খরচের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ আলাদা রাখা, বিভিন্ন মাধ্যমে সঞ্চয় বণ্টন করা এবং ঝুঁকি বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক লক্ষ্য অর্জনে দ্রুত ও অস্বাভাবিক মুনাফার প্রতিশ্রুতির চেয়ে পরিকল্পিত বিনিয়োগই বেশি যুক্তিসংগত পদ্ধতি।