বিশ্বকে বিভক্তকরণ: থ্রি ওয়ার্ল্ড বা তিন বিশ্বের তত্ত্ব

 

বর্তমান ভূরাজনীতিতে ‘প্রথম বিশ্ব’ বা ‘তৃতীয় বিশ্বের দেশ’ শব্দগুলো আমরা প্রায়ই শুনি। কিন্তু এই থ্রি ওয়ার্ল্ড মডেল (Three-World Model) আসলে কী? ১৯৫২ সালে ফরাসি জনসংখ্যাবিদ ও ইতিহাসবিদ আলফ্রেড সোভী (Alfred Sauvy) প্রথম এই তত্ত্বটির ধারণা দেন। মূলত ঠান্ডা লড়াইয়ের (Cold War) সময় বিশ্বকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর নির্ভর করে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছিল।

প্রথম বিশ্বের দেশ (First World Countries)

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, পশ্চিম ইউরোপের দেশসমূহ এবং জাপানের মতো পুঁজিবাদী ও গণতান্ত্রিক দেশগুলো প্রথম বিশ্বের অন্তর্ভুক্ত।

শর্ত ও বৈশিষ্ট্য: সাধারণত যেসব দেশে শক্তিশালী গণতন্ত্র ও আইনের শাসন রয়েছে, প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিমত্তার কারণে রাজনৈতিক ঝুঁকি কম, অর্থনৈতিকভাবে পুঁজিবাদে বিশ্বাসী, মাথাপিছু জাতীয় উৎপাদন (GDP) এবং শিক্ষার হার অনেক বেশি—তাদেরকেই প্রথম বিশ্বের দেশ বলা হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বের দেশ (Second World Countries)

মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বাধীন সমাজতান্ত্রিক ও কমিউনিস্ট ব্লকের দেশগুলোকে দ্বিতীয় বিশ্ব বলা হতো। এর মধ্যে ছিল রাশিয়া, পোল্যান্ড, চীন, কিউবা, লাওস ও ভিয়েতনামসহ প্রায় ১৯টি রাষ্ট্র।

শর্ত ও বর্তমান অবস্থান: এদের মূল ক্রাইটেরিয়া ছিল রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত বা সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর এই ব্লকের অস্তিত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়। বর্তমান বিশ্বে ‘দ্বিতীয় বিশ্ব’ শব্দের ব্যবহার নেই বললেই চলে; তবে এই ব্লকের চীন বা রাশিয়ার মতো দেশগুলো এখন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও সামরিক পরাশক্তি।

ঠান্ডা লড়াইয়ের সময় যারা মার্কিন বা সোভিয়েত—কোনো ব্লকেই যোগ দেয়নি (যেমন- ভারত, বাংলাদেশ এবং আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশ), তারাই মূলত তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্র।

বৈশিষ্ট্য ও বর্তমান অবস্থান: ঐতিহাসিকভাবে দীর্ঘকাল ঔপনিবেশিক শাসনের শিকার, দারিদ্র্য, জনসংখ্যা বিস্ফোরণ এবং ধীরগতির শিল্পায়নের কারণে এদের অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশ বলা হতো। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই ব্লকের অনেক দেশই (যেমন- বাংলাদেশ ও ভারত) দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করে নিজেদের উন্নয়নশীল ও উদীয়মান অর্থনীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে।