শিক্ষার বাড়তি ব্যয়, প্রাইভেট টিউশননির্ভরতা এবং মানসম্মত শিক্ষার অসম সুযোগ বাংলাদেশে অনলাইনভিত্তিক শিক্ষা বা এডটেক (EdTech) খাতের বিকাশে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়লেও তাদের নিয়মিত অর্থপ্রদানকারী গ্রাহকে পরিণত করা এবং লাভজনক ব্যবসা গড়ে তোলা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
এডুকেশন ওয়াচের ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৩ সালে দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের ১০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৯ জনের বেশি বাণিজ্যিক গাইডবই ব্যবহার করেছে। একই সময়ে প্রাথমিক পর্যায়ের প্রায় ৭০ শতাংশ এবং মাধ্যমিক পর্যায়ের তিন-চতুর্থাংশের বেশি শিক্ষার্থী প্রাইভেট টিউশন নিয়েছে। ফলে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার পাশাপাশি তুলনামূলক সাশ্রয়ী অনলাইন শিক্ষার চাহিদাও বাড়ছে।
রাজশাহীর শিক্ষার্থী ফারিয়া জামান অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বিভিন্ন বিষয়ের কোর্স এবং বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাঁর মতে, অনলাইন কোর্সে খরচ তুলনামূলক কম এবং ঘরে বসে পরিকল্পিতভাবে পড়াশোনা করা যায়। একইভাবে, প্রচলিত কোচিংয়ের বিকল্প হিসেবে অনলাইন ক্লাস ও রেকর্ডেড লেকচার ব্যবহার করছেন অনেক শিক্ষার্থী।
ব্যবহারকারী বাড়লেও আয় নিশ্চিত নয়
করোনাকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় ২০২০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে অনলাইন শিক্ষার ব্যবহার ও এ খাতে বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। ১০ মিনিট স্কুল ও শিখোর মতো প্রতিষ্ঠান এ সময় নিজেদের কার্যক্রম সম্প্রসারণ করে। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পুনরায় চালু হওয়ার পর কিছু ব্যবহারকারী কমে যায় এবং বিনামূল্যের অনলাইন কনটেন্ট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) নতুন প্রতিযোগিতা তৈরি করে।
ইউল্যাবের সেন্টার ফর এন্টারপ্রাইজ অ্যান্ড সোসাইটির পরিচালক সাজিদ আমিতের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের এডটেক স্টার্টআপ খাতে প্রকাশিত বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ থেকে ১ কোটি ৮০ লাখ ডলার। তবে খাতটির প্রকৃত আয় ও নিয়মিত অর্থপ্রদানকারী ব্যবহারকারীর নির্ভরযোগ্য সামগ্রিক তথ্য পাওয়া কঠিন।
তিন প্রতিষ্ঠানের তিন ধরনের ব্যবসায়িক মডেল
১০ মিনিট স্কুল অনলাইন ও সরাসরি শিক্ষার সমন্বিত মডেলে কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, গত বছর তাদের বার্ষিক আয় ৫০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে এবং অর্থপ্রদানকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৫০ হাজারের বেশি।
অন্যদিকে, শিখোর দাবি অনুযায়ী, তাদের প্ল্যাটফর্মে নিবন্ধিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৪০ লাখের বেশি এবং মাসিক সক্রিয় ব্যবহারকারী ৬ লাখের বেশি। ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির আয় আট গুণের বেশি বেড়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
চর্চা মূলত অনুশীলন, পরীক্ষা ও শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি মূল্যায়নকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়িক মডেল তৈরি করেছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতার তথ্য অনুযায়ী, গত বছর তাদের আয় ছিল ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
এআই ও ভবিষ্যতের সম্ভাবনা
এডটেক খাতে এআই ব্যক্তিগত শিক্ষাসহায়তা ও শিক্ষার্থীর দুর্বলতা শনাক্ত করার নতুন সুযোগ তৈরি করছে। তবে ভুল তথ্য, নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেটের অভাব, ডিভাইস সংকট এবং গ্রামীণ-শহুরে ডিজিটাল বৈষম্য এখনো গুরুত্বপূর্ণ বাধা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ভিডিও লেকচার বা নিবন্ধিত ব্যবহারকারীর সংখ্যা দিয়ে এডটেক প্রতিষ্ঠানের সাফল্য বিচার করা যথেষ্ট নয়। নিয়মিত অর্থপ্রদান, গ্রাহক ধরে রাখা, আয় বৃদ্ধি এবং শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শেখার ফলাফলই দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক স্থায়িত্বের গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
বাংলাদেশের এডটেক খাত তাই সম্ভাবনাময় হলেও এর ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে প্রযুক্তির পাশাপাশি মানসম্মত শিক্ষা, ব্যবহারকারীর আস্থা এবং টেকসই ব্যবসায়িক মডেল গড়ে তোলার ওপর।