ভূমিকা
বরিশাল মহানগরীতে সিটি বাস সার্ভিস বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকেই থ্রি-হুইলারের অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার, লাগামহীন ভাড়া বৃদ্ধি এবং রুট অরাজকতায় জিম্মি হয়ে পড়েছেন লাখ লাখ নগরবাসী। নথুল্লাবাদ, রূপাতলী, চৌমাথা কিংবা লঞ্চঘাটের মতো ব্যস্ততম মোড়গুলোতে প্রতিদিন সাধারণ যাত্রীদের সাথে অটোচালকদের বাকবিতণ্ডা নিত্যদিনের চিত্র। কোনো নির্দিষ্ট চার্ট বা প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ না থাকায় সাধারণ চাকরিজীবী ও শিক্ষার্থীদের পকেট কাটার এক নির্মম দলিল হয়ে উঠেছে নগরের বর্তমান পরিবহন ব্যবস্থা。
পরিবহন কাঠামোর ভাঙন ও থ্রি-হুইলারের গ্রাস
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, একটি আধুনিক শহরের প্রধান গণপরিবহন হওয়া উচিত বাসভিত্তিক ব্যবস্থা। কিন্তু বরিশালে গণ-বাস বন্ধ হওয়ার পর পুরো শহরের সিংহভাগ যাত্রী ব্যাটারিচালিত অটো ও সিএনজির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। জনসংখ্যা ও সড়কের ধারণক্ষমতার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি থ্রি-হুইলার নামায় রুট ব্যবস্থার সম্পূর্ণ ভাঙন ধরেছে। চালকেরা কোনো সময়সূচি বা নির্দিষ্ট স্টপেজ না মেনে যত্রতত্র গাড়ি দাঁড় করিয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানো করায় পুরো শহরের সড়ক ব্যবস্থা একটি স্থায়ী গোলকধাঁধায় পরিণত হয়েছে।
ভাড়া সিন্ডিকেট বিতর্ক ও নগর অর্থনীতিতে আঘাত
বরিশাল নগরীর প্রতিটি রুটে কোনো ধরনের সরকারি প্রজ্ঞাপন বা বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের (বিসিসি) লিখিত অনুমতি ছাড়াই হুটহাট ভাড়া বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। চালক সংগঠনগুলো সিন্ডিকেটের অস্তিত্ব অস্বীকার করলেও সাধারণ যাত্রীদের অভিযোগ—অদৃশ্য এক সিন্ডিকেটের ইশারায় একেক সময় একেক রকম ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। পরিবহন খাতের এই চরম অস্থিরতা এখন সরাসরি আঘাত হানছে সামগ্রিক নগর অর্থনীতিতে। ছোট যানবাহনের অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে পাইকারি বাজার (যেমন পোর্ট রোড) থেকে খুচরা বাজারে পণ্য পৌঁছানোর খরচ বেড়ে যাচ্ছে, যার চূড়ান্ত আর্থিক দায়ভার বইতে হচ্ছে সাধারণ ভোক্তাদের।
চালকদের অর্থনৈতিক সমীকরণ
অন্যদিকে চালক ও মালিক পক্ষেরও রয়েছে নিজস্ব কিছু যুক্তি। তাদের দাবি—সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাটারি চার্জিংয়ের জন্য বিদ্যুৎ খরচ, নতুন ব্যাটারির দাম এবং সড়কের বেহাল দশার কারণে গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ খরচ ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই সাথে চড়া সুদের কিস্তি এবং মহাজনের দৈনিক জমার টাকা পরিশোধের পর চালকদের সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। তবে সাধারণ যাত্রীদের মতে, চালক বা মালিকের ব্যক্তিগত ঋণের বোঝা সাধারণ মানুষের ওপর চাপানো সম্পূর্ণ অন্যায় এবং অবিলম্বে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে ভাড়া নির্ধারণের একটি জবাবদিহিমূলক কেন্দ্রীয় কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন।
—
FAQs
Q1: বরিশাল নগরীতে বর্তমান গণপরিবহন সংকটের মূল কারণ কী?
Ans: বরিশাল নগরীতে একসময়ের জনপ্রিয় সিটি বাস সার্ভিস সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং তার বিপরীতে কোনো সুশৃঙ্খল বিকল্প ব্যবস্থা না রেখে অপরিকল্পিতভাবে হাজার হাজার থ্রি-হুইলার ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার বিস্তারই এই সংকটের মূল কারণ।
Q2: অবৈধ ভাড়া বৃদ্ধি নিয়ে যাত্রী ও চালকদের মধ্যকার দ্বন্দ্বের মূল কারণ কী?
Ans: কোনো অনুমোদিত সরকারি তালিকা বা চার্ট ছাড়াই চালকেরা রুট ও সময়ের ওপর ভিত্তি করে নিজেদের ইচ্ছেমতো বাড়তি ভাড়া দাবি করে। অপরদিকে চালকদের দাবি, ব্যাটারির চড়া দাম, বিদ্যুৎ বিল ও মহাজনের দৈনিক কিস্তির চাপের কারণেই তারা ভাড়া বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন।
Q3: এই পরিবহন অরাজকতা কীভাবে বরিশালের সাধারণ বাজারে প্রভাব ফেলছে?
Ans: বড় গণপরিবহন না থাকায় ছোট যানবাহনে করে পোর্ট রোডের মতো পাইকারি বাজার থেকে পণ্য খুচরা বাজারে নিতে অতিরিক্ত পরিবহন খরচ গুনতে হচ্ছে। এই বর্ধিত খরচের কারণে খুচরা বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম তুলনামূলকভাবে চড়া থাকছে।