কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তিতে বাড়তে থাকা বিনিয়োগ বিশ্ব অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করছে। তবে একই সময়ে ভূরাজনৈতিক সংঘাত, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং সরকারি ঋণের চাপ বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সর্বশেষ পূর্বাভাসে এই দ্বিমুখী পরিস্থিতির চিত্র উঠে এসেছে।
আইএমএফের অক্টোবর ২০২৬ সালের World Economic Outlook প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছর বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি ৩.১ শতাংশ হতে পারে। ২০২৫ সালে এই হার ছিল ৩.৫ শতাংশ। ২০২৭ সালে প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৩.৪ শতাংশে পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। তবে এই হিসাবের পেছনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অনুমান রয়েছে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে।
প্রবৃদ্ধির নতুন চালিকাশক্তি এআই
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এআই-সম্পর্কিত অবকাঠামো, ডেটা সেন্টার, কম্পিউটিং প্রযুক্তি এবং সংশ্লিষ্ট সরঞ্জামে বিনিয়োগ বাড়ছে। এসব বিনিয়োগ প্রযুক্তি খাতের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও উৎপাদন কার্যক্রমেও প্রভাব ফেলছে।
তবে এআইয়ের সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদের পাশাপাশি ঝুঁকিও রয়েছে। বিনিয়োগকারীরা ভবিষ্যতে এআই থেকে প্রত্যাশিত মুনাফা না পেলে নতুন বিনিয়োগ কমিয়ে দিতে পারেন। এতে প্রযুক্তি খাতের শেয়ারবাজার এবং সংশ্লিষ্ট শিল্পের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া এআইয়ের সুফল সব দেশে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে না। প্রযুক্তিগত অবকাঠামো ও দক্ষ জনশক্তিতে এগিয়ে থাকা দেশগুলো তুলনামূলক বেশি সুবিধা পেতে পারে।
যুদ্ধ ও জ্বালানি বাজারের চাপ
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতির আরেকটি বড় অনিশ্চয়তা। সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে তেল ও অন্যান্য জ্বালানি পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন, উৎপাদন ও পণ্য আমদানির খরচ বেড়ে যায়। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ের দামেও পড়তে পারে।
আইএমএফের মূল্যায়নে, জ্বালানি ব্যয়ের চাপ মূল্যস্ফীতি বাড়াতে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে ধীর করতে পারে। পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার দীর্ঘ সময় উঁচু রাখতে হতে পারে। এতে ব্যবসার ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়বে এবং নতুন বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
বাড়ছে সরকারি ঋণ নিয়ে উদ্বেগ
বিশ্ব অর্থনীতির আরেকটি চ্যালেঞ্জ হলো সরকারি ঋণ ও সুদ পরিশোধের ব্যয়। ঋণের বোঝা বাড়লে সরকারকে বাজেটের বড় অংশ সুদ পরিশোধে ব্যয় করতে হতে পারে। ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও উন্নয়নমূলক খাতে ব্যয়ের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে।
এ অবস্থায় আইএমএফের সুপারিশ হলো, দেশগুলোকে আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে লক্ষ্যভিত্তিক ও সাময়িক পদক্ষেপের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য আন্তর্জাতিক জ্বালানির দাম, বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ এবং বৈশ্বিক চাহিদার পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানির দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় ও পরিবহন খরচ বাড়তে পারে, যা উৎপাদন ব্যয় এবং বাজারদরের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
অন্যদিকে, এআই ও ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তার বাংলাদেশের ব্যবসা, সেবা খাত এবং দক্ষতাভিত্তিক কর্মসংস্থানের জন্য নতুন সুযোগও তৈরি করতে পারে। তবে এসব সুযোগ কাজে লাগাতে প্রযুক্তিগত দক্ষতা, নির্ভরযোগ্য অবকাঠামো এবং উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, বিশ্ব অর্থনীতি এখন প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সুফল এবং বৈশ্বিক সংকটের ঝুঁকির মধ্যে ভারসাম্য খুঁজছে। এআই বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধিকে সহায়তা করলেও তা একা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারবে না। জ্বালানি নিরাপত্তা, দায়িত্বশীল আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতাই আগামী দিনের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সূত্র: আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF), World Economic Outlook, October 2026: Resilience Under Strain, Urgent Choices।