ইউ-টার্ন নয়, একটি সেতুবন্ধন: ভ্যাটের সময়সূচি পুনর্বিন্যাসের যৌক্তিকতা

মাঝেমধ্যে সংসদে পাস হওয়া একটি আইনই একটি সরকারের মানসিকতা সম্পর্কে একশটি বক্তৃতার চেয়ে বেশি কিছু বলে দেয়। অর্থ আইন ২০২৬ তেমনই একটি আইন। এক আইনেই ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের সংখ্যা বছরে ১২ বার থেকে কমিয়ে চারবার করা হয়েছে। কর দাবির বিরুদ্ধে আপিল করতে যে ১০ শতাংশ অর্থ জমা দিতে হতো, তা কমিয়ে সর্বনিম্ন ১ শতাংশ করা হয়েছে—অর্থাৎ কর কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার ক্ষেত্রে নগদ অর্থের তাৎক্ষণিক চাপ ৮৫ শতাংশ কমেছে। উৎসে কর কর্তনের ক্ষেত্রে সামান্য করণিক ভুলের কারণে কোনো প্রতিষ্ঠানের একটি পরিশোধের ২৭.৫ শতাংশ পর্যন্ত খরচ হিসেবে বাদ দেওয়ার যে কঠোর বিধান ছিল, সেটিও বাতিল করা হয়েছে। করপোরেট ও ব্যক্তিগত করহার টানা পাঁচ বছরের জন্য নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এতে বিনিয়োগকারীরা বহুদিনের চাওয়া একটি বিষয় পেয়েছেন—অনিশ্চিত গুঞ্জনের বদলে পরিকল্পনা করার মতো একটি নির্দিষ্ট হার। পুরোনো ভ্যাট বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ সুযোগ দেওয়া হয়েছে, পুরোনো বকেয়ার সুদের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং ভ্যাট নিবন্ধনকে স্বয়ংক্রিয় করা হয়েছে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো সরকারই এক বছরে করব্যবস্থাকে ব্যবসাবান্ধব করার পথে এতটা এগিয়ে যায়নি। আর এর কেন্দ্রবিন্দু ছিল ত্রৈমাসিক ভ্যাট দাখিলের সুবিধা—যে সুবিধা কাউকে খুশি করার জন্য বাধ্য হয়ে দেওয়া হয়নি; এটি ছিল অর্থমন্ত্রীর নিজের স্বাক্ষরে বাস্তবায়িত মন্ত্রণালয়ের দর্শনেরই প্রতিফলন।

সেপ্টেম্বরে সেই সুবিধা নিয়ে যে পর্যালোচনা চলছে, সেটি তাই এই প্রেক্ষাপটেই দেখা উচিত—উচ্চস্বরে নয়, বরং সতর্কতার সঙ্গে। কারণ, কোনো সরকার সাধারণত নিজের উদ্যোগে নেওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারকে পুনরায় পর্যালোচনা করে সেটিকে কবর দেওয়ার জন্য নয়; বরং সেটিকে টিকিয়ে রাখার জন্যই সংশোধনের পথ খোঁজে। তাই দেশের সামনে এখন যে প্রকৃত প্রশ্নটি রয়েছে, তা এই নয় যে—ত্রৈমাসিক ভ্যাট ব্যবস্থা সঠিক ছিল কি না। সেটি সঠিক ছিল এবং এখনো আছে। প্রশ্ন হলো, এই বছরটিই কি এমন একটি বছর, যখন রাষ্ট্রের কোষাগার এই সময়সূচির আর্থিক প্রভাব বহন করতে পারবে?

কী বিষয়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে, সেটি শুরুতেই পরিষ্কার হওয়া দরকার। কারণ বিষয়টি শুনতে যতটা বড় মনে হচ্ছে, বাস্তবে এটি তার চেয়ে অনেক বেশি সীমিত। নতুন কোনো কর আরোপের প্রস্তাব নেই। কোনো ব্যবসার ওপর এক টাকাও অতিরিক্ত বোঝা চাপানোর কথা বলা হচ্ছে না। ভ্যাট হলো এমন অর্থ, যা একজন দোকানদার বা উৎপাদক পণ্য বিক্রির সময় ভোক্তার কাছ থেকে ইতোমধ্যে সংগ্রহ করেছেন—অর্থাৎ এটি জনগণের অর্থ, যা সাময়িকভাবে কোনো ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকে এবং পরে রাষ্ট্রের কোষাগারে জমা হয়।

প্রশ্নটি কেবল সেই অর্থের যাত্রাপথ কতটা দীর্ঘ হবে, তা নিয়ে। আগের ব্যবস্থায় মাস শেষ হওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে অর্থ জমা পড়ত; জুলাইয়ের পর থেকে চালু হওয়া ব্যবস্থায় সেই অর্থ জমা দিতে সাড়ে তিন মাস পর্যন্ত সময় পাওয়া যাচ্ছে। এটি কর বাড়ানোর বিষয় নয়; এটি শুধু অর্থ জমা দেওয়ার সময়ের ঘড়ি এগিয়ে-পেছানোর বিষয়।

আর এই বছর সেই ঘড়িটি অন্য যেকোনো সাম্প্রতিক বছরের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এমন একটি বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, যার বিরুদ্ধে বিশ্বের কোনো অর্থ মন্ত্রণালয়ই আগাম আইন করতে পারে না।

ফেব্রুয়ারিতে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ কার্যত হরমুজ প্রণালির পথ বন্ধ করে দেওয়ার পর বাংলাদেশ—যে দেশটি তার এলএনজির প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এই সংকীর্ণ সমুদ্রপথ দিয়ে আমদানি করত—জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখন চালানভিত্তিতে স্পট মার্কেট থেকে গ্যাস কিনছে। কাতারএনার্জিসহ অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘ফোর্স মেজর’ বা অনিবার্য পরিস্থিতির কারণে সরবরাহ বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে। জরুরি চালানের জন্য পেট্রোবাংলাকে প্রতি ইউনিটে সর্বোচ্চ ২৮ ডলার পর্যন্ত দিতে হয়েছে—২০২২ সালের পর থেকে যা দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল গ্যাস। বছরের নির্ধারিত ১১৫টি চালানের মধ্যে প্রায় ৪০টি চালান না পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

স্বাধীন বিশ্লেষকদের হিসাবে, এ বছর অতিরিক্ত জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানিতে বাংলাদেশের ব্যয় ২.৮ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে। শুধু এলএনজি ভর্তুকির পরিমাণই প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।

ঢাকা থেকে হরমুজ প্রণালির দূরত্ব চার হাজার কিলোমিটার। কিন্তু সেটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রভাব দেশের প্রতিটি দোকানের ক্যাশ কাউন্টার, প্রতিটি কারখানার উৎপাদন ব্যয় এবং প্রতিটি বিদ্যুৎ লাইনে অনুভূত হচ্ছে। যুদ্ধ বিদেশে হয়, কিন্তু তার অর্থনৈতিক মূল্য দিতে হয় দেশের ভেতর থেকেই।

তার ওপর এই সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে এমন একটি কোষাগারকে, যার দুর্বলতা বর্তমান সরকারের তৈরি নয়; বরং সরকার সেটি উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে। বাংলাদেশ এমনিতেই বিশ্বের অন্যতম কম কর-জিডিপি অনুপাতের দেশ হিসেবে এই সংকটে প্রবেশ করেছে। ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে স্পট মার্কেট থেকে জ্বালানি কেনার ফলে জ্বালানি ভর্তুকির বকেয়া জমেছে। গত অর্থবছরে রাজস্ব ঘাটতি ছিল প্রায় ৮৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

এসবই বর্তমান প্রশাসনের আগে থেকে বিদ্যমান ছিল। এগুলোর কোনোটিই অস্বীকার করার সুযোগ নেই। আর প্রতিটি ঘাটতিই এমন একটি ধাক্কা সামলানোর ক্ষেত্রে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা আরও সংকুচিত করে, যে ধাক্কাটি এই সরকার নিজে সৃষ্টি করেনি।

তাই কোনো অর্থ মন্ত্রণালয় যখন একটি সীমিত আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং এরপর একটি যুদ্ধ সেই সীমিত সক্ষমতাকেও আরও কমিয়ে দেয়, তখন তাদের এই সাময়িক পদক্ষেপকে সংস্কার থেকে পিছু হটা বলা ঠিক নয়। বরং এটি সেই ভিত্তিটুকু রক্ষা করার চেষ্টা, যার ওপর ভবিষ্যতের সব সংস্কার দাঁড়িয়ে আছে।

এখানে হিসাবটি সহজ ভাষায় বলা দরকার। পুরোনো ব্যবস্থায় জুলাই মাসে সংগৃহীত ভ্যাট আগস্টের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যেই রাষ্ট্রের কোষাগারে পৌঁছে যেত। নতুন ব্যবস্থায় জুলাই মাসে সংগৃহীত ভ্যাট আইনত অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে থাকতে পারে।

এই সময়ের ব্যবধানটি প্রায় আট লাখ নিবন্ধিত ব্যবসায়ীর ওপর প্রয়োগ করলে দেখা যায়, প্রায় দুই মাসের জাতীয় ভ্যাট আদায়ের সমপরিমাণ অর্থ—গত বছরের আদায়ের হিসাবে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা—সাময়িকভাবে সরকারি কোষাগারের বদলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে থেকে যাচ্ছে।

প্রাথমিক তথ্যও একই প্রবণতা দেখাচ্ছে। জুলাই ও আগস্টে ভ্যাট আদায় হয়েছে ১৭ হাজার ৬৬৩ কোটি টাকা, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে আদায় হয়েছিল ২২ হাজার ৬২৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ টাকা হারিয়ে যায়নি; টাকা জমা দেওয়ার সময় পিছিয়ে গেছে।

কিন্তু সরকারি কোষাগার কোনো ‘আইওইউ’ (IOU) বা ভবিষ্যতে টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতির ওপর চলতে পারে না। সরকারি কর্মচারীদের বেতন, পেনশন, সার ভর্তুকি এবং জরুরি গ্যাসের চালান কেনার জন্য প্রয়োজনীয় ঋণপত্র—সবকিছুর অর্থ মাসে মাসেই পরিশোধ করতে হয়। যুদ্ধ হোক বা না হোক, রাষ্ট্র অনেক কিছু পিছিয়ে দিতে পারে; কিন্তু বেতন দেওয়ার দিন পিছিয়ে দেওয়া যায় না।

ফলে সরকারকে এই সাময়িক ঘাটতি পূরণ করতে ঋণ নিতে হয়। আর বর্তমান ট্রেজারি সুদের হারে ২০ হাজার কোটি টাকা ধার করে রাখার বার্ষিক খরচ দাঁড়ায় প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা। সহজ করে বললে, জনগণ যে অর্থ ইতোমধ্যে পরিশোধ করেছে, সেই অর্থ কিছুদিন অপেক্ষা করে থাকায় তার ওপর সরকারকে সুদ দিতে হচ্ছে।

স্বাভাবিক একটি বছরে ব্যবসার ওপর চাপ কমানোর বিনিময়ে এই খরচ মেনে নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু যে বছরে গ্যাস কিনতেই প্রতি ইউনিটে ২৮ ডলার পর্যন্ত দিতে হচ্ছে, সেই বছরে জাতীয় অর্থনীতি এই অতিরিক্ত খরচ বহন করার অবস্থায় নেই।

তবে শুরুতেই একটি বিষয় স্বীকার করা দরকার। এই স্বীকারোক্তি করলেই বরং ভ্যাট ব্যবস্থা পুনর্বিন্যাসের যুক্তিটি আরও শক্তিশালী হয়। ত্রৈমাসিক ভ্যাট সুবিধাটি এমন এক সময় চালু হয়েছে, যখন এটি পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা পুরোপুরি প্রস্তুত ছিল না।

ভ্যাটের প্রতিটি চালান তৈরি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অর্থ এখনো স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরকারি কোষাগারে পৌঁছে যায় না। অন্যদিকে, রাজস্ব বোর্ডের মাঠপর্যায়ের কার্যালয়গুলো যে মাসিক হিসাব ও নজরদারি ব্যবস্থার ওপর এতদিন নির্ভর করেছে, সেটি তিন মাস অন্তর রিটার্ন দাখিলের ব্যবস্থার সঙ্গে পুরোপুরি খাপ খায় না।

এখানে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ভূমিকারও প্রশংসা করা দরকার। নিজেদের ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা একটি প্রতিষ্ঠান নিজেই স্বীকার করতে পারা প্রমাণ করে যে সমস্যাটি সমাধানের ব্যাপারে প্রতিষ্ঠানটি আন্তরিক।

বিশ্বের কর প্রশাসন ব্যবস্থায় এটি একটি পরিচিত সমস্যা। কর সংস্কারের নীতি অনেক সময় সেই নীতি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক অবকাঠামোর চেয়ে দ্রুত এগিয়ে যায়। বাংলাদেশেও এখন সেই অবকাঠামো তৈরি হচ্ছে—ডিজিটাল ইনভয়েসিং, স্বয়ংক্রিয় নিবন্ধনসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে।

কিন্তু একটি কার্যকর করব্যবস্থার প্রযুক্তিগত অবকাঠামো তৈরি হতে কয়েকটি ত্রৈমাসিক সময় লাগতে পারে। অন্যদিকে সরকারি কোষাগারের বিল পরিশোধের সময়সীমা কয়েক সপ্তাহ। আর এখানেই বৃহত্তর অর্থনৈতিক বাস্তবতার গুরুত্ব।

তবে এসব কিছুই কোনো রূঢ় বা সরাসরি প্রত্যাহারের পক্ষে যুক্তি দেয় না। বরং সরকারের কৃতিত্ব হলো—এমন কোনো প্রত্যাহারের প্রস্তাবও করা হচ্ছে না।

অর্থমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এটি সঠিক পথ। আর এই পদ্ধতিই একটি পুনর্বিন্যাসকে পশ্চাদপসরণ থেকে আলাদা করে।

আমাদের বর্তমান কর আইনের মধ্যেই এর একটি কার্যকর ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাধানের উদাহরণ রয়েছে। অগ্রিম আয়কর ব্যবস্থায় বহু বছর ধরেই করদাতাদের সারা বছর ধরে আনুমানিক করের কিস্তি পরিশোধ করতে হয় এবং পরে রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় চূড়ান্ত হিসাব সমন্বয় করা হয়। একই কাঠামো ভ্যাটের ক্ষেত্রেও কার্যকর হতে পারে।

ত্রৈমাসিক রিটার্নের সুবিধা বহাল রাখা যেতে পারে—অর্থাৎ ব্যবসাকে আগের মতো প্রতি মাসে নয়, তিন মাসে একবার রিটার্ন দাখিল করতে হবে। এতে মূল কমপ্লায়েন্স বা নিয়মপালনের সুবিধাটি পুরোপুরি বজায় থাকবে। তবে সংগৃহীত ভ্যাটের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ—ধরা যাক প্রায় তিন-চতুর্থাংশ—প্রতি মাসেই সরকারি কোষাগারে জমা দিতে বলা যেতে পারে। বাকি অংশ ত্রৈমাসিক রিটার্নের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে।

এতে ব্যবসায়ীরা কাগজপত্র ও প্রশাসনিক কাজের ক্ষেত্রে স্বস্তি পাবেন এবং একই সঙ্গে কিছুটা কার্যকরী মূলধন বা ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল ব্যবহারের সুযোগও থাকবে। অন্যদিকে রাষ্ট্র তার প্রয়োজনীয় মাসিক রাজস্ব প্রবাহ ফিরে পাবে—যা যুদ্ধকালীন বা সংকটাপন্ন অর্থনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ উভয় পক্ষই কিছুটা সময়ের সমন্বয় করবে। কিন্তু কোনো পক্ষকেই এক টাকাও অতিরিক্ত দিতে হবে না।

পাশাপাশি সরকারের প্রতিশ্রুতিও অন্য দিক থেকে আরও স্পষ্ট হওয়া উচিত। এই মন্ত্রণালয়ের এখন পর্যন্ত নেওয়া পদক্ষেপগুলো দেখায়, ব্যবসা ও বিনিয়োগকে সহজ করার প্রবণতাই তাদের মূল দর্শন। তাই আর্থিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সেই নীতিই আবার সামনে আসবে—এমন প্রত্যাশা দেশের ব্যবসায়ী সমাজের থাকা স্বাভাবিক।

জ্বালানি সংকট কমে গেলে এবং রাজস্ব আদায় পরিস্থিতির উন্নতি হলে সরকারকে জুলাইয়ে যে উদারতা দেখানো হয়েছিল, ঠিক সেই অবস্থায় ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি থাকা উচিত। পরিস্থিতি অনুকূল হলে পুরো ত্রৈমাসিক সুবিধা আবার চালু করা যেতে পারে—অথবা তার চেয়েও ভালো কোনো ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

তবে এর জন্য শুধু অস্পষ্ট আশ্বাস যথেষ্ট নয়। সরকারকে একটি স্পষ্ট ও প্রকাশ্য শর্ত বা সূচক নির্ধারণ করা উচিত, যার ভিত্তিতে বলা যাবে—কোন পরিস্থিতিতে পূর্ণ ত্রৈমাসিক সুবিধা আবার ফিরিয়ে দেওয়া হবে।

কারণ লিখিতভাবে ফিরে আসার পথ রেখে সাময়িকভাবে কোনো সুবিধা স্থগিত করা হলে সেটি একটি সেতু। কিন্তু কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই কোনো সুবিধা প্রত্যাহার করে নিলে সেটি হয়ে যায় প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ। আর নীরবতা এই মন্ত্রণালয়ের বর্তমান কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

শেষ পর্যন্ত এই মুহূর্তটিকে বিচার করার মানদণ্ডও এটিই হওয়া উচিত।

ব্যবসা ও উদ্যোক্তাদের প্রতি উদাসীন কোনো সরকার হলে আগস্টেই কোনো আলোচনা ছাড়াই প্রজ্ঞাপন জারি করে এই সুবিধা বাতিল করতে পারত। কিন্তু বর্তমান সরকার এই সুবিধা আইন করে চালু করেছে, এরপর একটি যুদ্ধ এসে এর আর্থিক ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দিয়েছে, সরকার সমস্যাটিকে প্রকাশ্যে স্বীকার করেছে এবং যাদের ওপর সিদ্ধান্তটির প্রভাব পড়বে, তাদের সঙ্গে আলোচনা করার পথও খুলে দিয়েছে।

এই সময়ে সরকারের কাছে যা চাওয়া হচ্ছে, তা কোনো ত্যাগ নয়; শুধু সময়ের ক্রমে সামান্য পরিবর্তন। অর্থাৎ জনগণের কাছ থেকে আগে থেকেই সংগৃহীত অর্থটি এমন একটি সময়ে কিছুটা দ্রুত সরকারি কোষাগারে পৌঁছাবে, যখন রাষ্ট্রকে দেশের প্রতিটি উৎপাদন ব্যবস্থা সচল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানির পেছনে দ্বিগুণ অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।

এটি কোনো পক্ষের কাছে আত্মসমর্পণ নয়। এটি একটি অংশীদারিত্ব। আর অংশীদারিত্বের প্রকৃত মূল্যায়ন হয় এমন একটি কঠিন সময়ে নয়, যখন দুই পক্ষের স্বার্থে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে; বরং সেই সময়ে, যখন পরিস্থিতির চাপ কমে যাওয়ার পরও দেখা যায়—দুই পক্ষই তখনও একসঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে।


লেখক: আশফাক জামান, ঢাকা ফোরাম ইনিশিয়েটিভের চিফ স্ট্র্যাটেজিস্ট

মতামত লেখকের নিজস্ব