কর্মক্ষেত্রে ‘না’ বলতে শেখা কেন আপনার সুস্থতার জন্য জরুরি

কর্মক্ষেত্রে অতিরিক্ত দায়িত্ব নেওয়ার আগে নিজের সীমা নির্ধারণ করা বা প্রয়োজন হলে ‘না’ বলা অনেকের কাছেই কঠিন মনে হয়। সহকর্মী কিংবা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার অনুরোধ ফিরিয়ে দেওয়া মানে অনেকের চোখে অদক্ষ, অনাগ্রহী বা দায়িত্বহীন হিসেবে বিবেচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ ও কার্যকর কর্মজীবনের জন্য কাজের সীমা বা work boundaries নির্ধারণ করা অত্যন্ত জরুরি।

এই সীমাগুলো কর্মীদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অতিরিক্ত কাজের চাপ থেকে তৈরি হয় মানসিক ক্লান্তি, দীর্ঘস্থায়ী স্ট্রেস, ঘুমের সমস্যা এবং কর্মক্ষমতার অবনতি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেকোনো নতুন দক্ষতার মতোই সীমা নির্ধারণের অভ্যাসও অনুশীলনের মাধ্যমে সহজ হয়ে ওঠে। শুরুতে অস্বস্তিকর মনে হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি আত্মবিশ্বাস ও আত্মসম্মানের অংশ হয়ে দাঁড়ায়।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যমে কর্মরত ৩৬ বছর বয়সী প্রোডাকশন অ্যাসিস্ট্যান্ট জাস্টিন স্টুয়ার্টের অভিজ্ঞতা বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করে। তিনি অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে জানান, ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে তিনি নিজের কাজের সীমা নির্ধারণ করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। একটি পূর্ণকালীন চাকরির পাশাপাশি তিনি বিমানবন্দরে গাড়ি ভাড়া দেওয়া এবং একটি দোকানে বিক্রয়কর্মীর কাজ করতেন। কাজের চাপ এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে মাঝে মাঝে তিনি এক কাজ শেষ করে আরেক কাজে যাওয়ার ফাঁকে নিজের গাড়িতেই ঘুমাতেন।

এই অতিরিক্ত ব্যস্ততা একপর্যায়ে তার স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। চরম ক্লান্তি ও সংক্রমণের কারণে তাকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। স্টুয়ার্ট বলেন, “আমার চারপাশের মানুষ আমার পরিশ্রমের প্রশংসা করত, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার মূল্য আমাকে আমার শরীর দিয়েই দিতে হয়েছে।” চিকিৎসক তাকে স্পষ্টভাবে জানান, এত অল্প বয়সে এত চাপ নেওয়া তার জন্য বিপজ্জনক এবং তাকে অবশ্যই কোনো না কোনো কাজ ছেড়ে দিতে হবে।

এই অভিজ্ঞতার পর স্টুয়ার্ট নিজের কাজের ধরনে পরিবর্তন আনেন। তিনি অতিরিক্ত আয়ের কথা চিন্তা না করে পার্শ্বচাকরিগুলো ছেড়ে দেন। এমনকি অফিসের কাজের বাইরের সময়ে যদি তাকে নতুন কোনো দায়িত্ব দেওয়া হতো, তিনি বিনয়ের সঙ্গে জানিয়ে দিতেন যে তিনি তখন উপলব্ধ নন এবং প্রয়োজনে অন্য কারও নাম প্রস্তাব করতেন। তার ভাষায়, এতে কাজের মান যেমন উন্নত হয়েছে, তেমনি জীবনে স্বস্তিও ফিরে এসেছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এমন পরিবর্তন আনা সবার জন্য সহজ নয়। অনেক মানুষ সহকর্মী বা ব্যবস্থাপকের অনুরোধ ফিরিয়ে দিতে মানসিকভাবে অস্বস্তি বোধ করেন। কারও কারও ক্ষেত্রে অন্যকে খুশি করা বা প্রয়োজনীয় বলে বিবেচিত হওয়াই আত্মতৃপ্তির উৎস হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এই মানসিকতা কর্মীদের ক্লান্ত ও হতাশ করে তোলে।

কর্মজীবনের ভারসাম্য বজায় রাখতে বিশেষজ্ঞরা সময় ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেন। নিজের প্রতিদিনের কাজগুলো আগেভাগে পরিকল্পনা করলে কোন কাজটি জরুরি আর কোনটি পরে করা যায়, তা স্পষ্ট হয়। ইভেন্ট প্রোডাকশন কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা ববি ডাটন জানান, তিনি সপ্তাহের শুরুতেই সবচেয়ে কঠিন বা এড়িয়ে যেতে ইচ্ছুক কাজটি নির্ধারণ করে রাখেন। এমনকি ব্যক্তিগত কাজ—যেমন হাঁটা বা খাবারের সময়—তালিকাভুক্ত করে রাখেন, যাতে কাজের চাপে সেগুলো বাদ না পড়ে।

‘না’ বলার অনুশীলনও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। কর্মস্থলে এনগেজমেন্ট কোচ কারা হাউসার বলেন, অনুরোধ ফিরিয়ে দিতে গেলে সবসময় দীর্ঘ ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। বিনয়ের সঙ্গে “আমি এখন উপলব্ধ নই” বলা কিংবা “পরে এই বিষয়ে কথা বলা যেতে পারে”—এই ধরনের সংক্ষিপ্ত উত্তরই যথেষ্ট।

নিজেকে জানা ও বোঝাও সীমা নির্ধারণের একটি বড় অংশ। কোনো নতুন কাজের অনুরোধ পেলে সঙ্গে সঙ্গে সম্মতি দেওয়ার বদলে একটু সময় নিয়ে ভাবা প্রয়োজন। কাজের চাপ, মানসিক শক্তি ও ব্যক্তিগত আগ্রহ—এই বিষয়গুলো বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিলে ভবিষ্যতে চাপ কমে। নিউইয়র্কের সাইকোথেরাপিস্ট ইসরা নাসির বলেন, যেসব কাজ বা মিথস্ক্রিয়া বারবার ক্লান্তি ও স্ট্রেস তৈরি করে, সেগুলো আলাদা করে চিহ্নিত করা উচিত। প্রয়োজনে সেগুলো একটি ‘না তালিকা’তে রাখা যেতে পারে।

প্রযুক্তিও সীমা নির্ধারণে সহায়ক হতে পারে। সারাক্ষণ কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকার সুযোগ থাকলেও, তা যে ব্যবহার করতেই হবে—এমন নয়। নাসির জানান, তিনি একসময় সপ্তাহান্তে অপ্রয়োজনে বারবার ইমেইল চেক করতেন। পরে ইমেইল অ্যাপটি ফোনের হোমস্ক্রিন থেকে সরিয়ে রাখায় এই অভ্যাস অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসে।

সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কর্মক্ষেত্রে ‘না’ বলতে শেখা কোনো দুর্বলতা নয়। বরং এটি সুস্থ জীবন, টেকসই কর্মক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পেশাগত সাফল্যের জন্য অপরিহার্য একটি দক্ষতা।

 FAQ

প্রশ্ন: কর্মক্ষেত্রে ‘না’ বলা কি অপেশাদার আচরণ?

উত্তর: না। বরং এটি আত্মসচেতনতা, দায়িত্ববোধ ও পেশাদারিত্বেরই একটি অংশ।

প্রশ্ন: সীমা নির্ধারণ কীভাবে শুরু করা যায়?

উত্তর: কাজের চাপ, নিজের শক্তি ও সময় বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং প্রয়োজনে সময় নিয়ে উত্তর দেওয়া থেকে শুরু করা যেতে পারে।

প্রশ্ন: বারবার কাজের অনুরোধ এলে কী বলা উচিত?

উত্তর: সরাসরি ‘আমি এখন উপলব্ধ নই’ বা ‘পরে দেখা যেতে পারে’—এই ধরনের সংক্ষিপ্ত ও ভদ্র উত্তর কার্যকর।

এমন আরও কর্মজীবন, মানসিক স্বাস্থ্য ও লাইফস্টাইল বিষয়ক লেখা পেতে আমাদের পেজটি ফলো করুন।

Follow foe more