বিশ্বজুড়ে পুরুষদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হৃদ্রোগ—আর বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। কর্মজীবন, পরিবার ও দৈনন্দিন চাপ সামলাতে গিয়ে পুরুষরা প্রায়ই নিজের স্বাস্থ্যের দিকে নজর দেন না। কিন্তু এই অবহেলাই ধীরে ধীরে হৃদ্যন্ত্রের ওপর নীরব চাপ সৃষ্টি করে।
বিশ্ব পুরুষ দিবসে বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন—পুরুষদের হৃদ্স্বাস্থ্য রক্ষা করা শুধু চিকিৎসার বিষয় নয়, এটি আত্ম-যত্ন ও দীর্ঘজীবনের প্রশ্ন।
জাতীয় হৃদ্রোগ ইনস্টিটিউট (NICVD)-এর মেডিসিন স্পেশালিস্ট ও কার্ডিওলজিস্ট ডা. আশরাফ উর রহমান জানান, তাঁর কাছে আসা হৃদ্রোগীদের বড় একটি অংশই চল্লিশোর্ধ্ব পুরুষ।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, পুরুষ ও নারীর হৃদ্স্বাস্থ্যের পার্থক্য শুরু হয় হরমোন থেকেই। নারীদের শরীরে থাকা ইস্ট্রোজেন রক্তনালি ও কোলেস্টেরলের ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক ভূমিকা রাখে। পুরুষদের ক্ষেত্রে এই প্রাকৃতিক সুরক্ষা নেই। ফলে তুলনামূলক কম বয়সেই পুরুষরা ইসকেমিক হার্ট ডিজিজ (IHD)-এর ঝুঁকিতে পড়েন। নারীরা মেনোপজে পৌঁছানোর পর এই ঝুঁকি প্রায় সমান হয়ে যায়।
“হরমোন নারীদের একটা প্রাথমিক সুবিধা দেয়,” বলেন ডা. রহমান। “পুরুষরা সেই সুবিধা না পাওয়ায় অস্বাস্থ্যকর অভ্যাস যুক্ত হলে হৃদ্রোগের ঝুঁকি অনেক আগেই শুরু হয়।”
জীবনযাত্রার প্রভাব
জৈবিক ঝুঁকির পাশাপাশি জীবনযাপনও বড় ভূমিকা রাখে। ব্যস্ততার কারণে অনেক পুরুষই খাবারের মানের সঙ্গে আপস করেন। অনিয়মিত ঘুম, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ ও ধূমপানের মতো আসক্তি ধীরে ধীরে হৃদ্যন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত করে।
আধুনিক কর্মজীবনের চাপ পুরুষদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপ ও করোনারি আর্টারি ডিজিজের ঝুঁকি বাড়ায়। যাদের পরিবারে হৃদ্রোগের ইতিহাস রয়েছে, তাদের ঝুঁকি আরও বেশি—এবং তাদের আগেভাগেই স্বাস্থ্য পরীক্ষা শুরু করা উচিত।
উপসর্গ যা উপেক্ষা করা হয়
বাংলাদেশি পুরুষদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় করোনারি আর্টারি ডিজিজ, ইসকেমিক হার্ট ডিজিজ ও হাইপারটেনশন। এগুলো বছরের পর বছর নীরবে বেড়ে ওঠে।
ডা. রহমান সতর্ক করেন, “অনেক পুরুষই হালকা উপসর্গকে গুরুত্ব দেন না। মাথাব্যথা, সহজে ক্লান্ত হয়ে পড়া, বুকে অস্বস্তি বা পা ফোলা—এসব শুধু ক্লান্তির লক্ষণ নয়, হৃদ্যন্ত্রের সংকেত হতে পারে।”
শ্বাসকষ্ট বা কর্মক্ষমতা হ্রাসও প্রাথমিক লক্ষণ। সময়মতো চিকিৎসা নিলে বহু হার্ট অ্যাটাক এড়ানো সম্ভব বলে তিনি জানান।
আগাম পরীক্ষা কেন জরুরি
ডা. রহমানের জোরালো বার্তা—আগাম শনাক্তকরণই জীবন বাঁচায়। চল্লিশোর্ধ্ব পুরুষদের, বিশেষ করে যাদের পারিবারিক ইতিহাস আছে, তাদের বছরে অন্তত একবার রক্তচাপ, লিপিড প্রোফাইল, ECG ও প্রয়োজনে স্ট্রেস টেস্ট করা উচিত।
“হৃদ্রোগ হঠাৎ হয় না, এটি ধীরে গড়ে ওঠে,” তিনি বলেন। “আগে ধরতে পারলে হৃদ্যন্ত্র রক্ষা করা সম্ভব।”
ছোট পরিবর্তন, বড় ফল
হৃদ্স্বাস্থ্য রক্ষায় কঠোর জীবন পরিবর্তন নয়, বরং নিয়মিত ছোট পদক্ষেপই যথেষ্ট। ধূমপান ত্যাগ, ঘরে তৈরি খাবার খাওয়া, নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম হৃদ্যন্ত্রকে সুস্থ রাখে।
সপ্তাহে অন্তত ৩–৫ দিন ৩০–৪৫ মিনিট ব্যায়াম করার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। ব্যায়াম শুধু শরীর নয়, মানসিক চাপও কমায়—যা হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্ব পুরুষ দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—নীরবে সহ্য করাই শক্তি নয়, বরং নিজের যত্ন নেওয়াই প্রকৃত বুদ্ধিমত্তা।
ডা. রহমানের কথায়,
“স্বাস্থ্য কোনো খরচ নয়, এটি বিনিয়োগ। আজ হৃদ্যন্ত্রের যত্ন নিন, ভবিষ্যৎ আপনাকে তার ফল দেবে।”
3. FAQ
Q1: কোন বয়স থেকে পুরুষদের হৃদ্পরীক্ষা করা উচিত?
👉 সাধারণভাবে ৪০ বছর থেকে, তবে পারিবারিক ইতিহাস থাকলে আরও আগে।
Q2: হালকা বুকে অস্বস্তি কি বিপজ্জনক?
👉 হ্যাঁ, এটি হৃদ্রোগের প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে।
Q3: ব্যায়াম না করলে কি শুধু ওষুধে কাজ হবে?
👉 না, জীবনযাত্রার পরিবর্তন ছাড়া পূর্ণ সুরক্ষা সম্ভব নয়।
হৃদ্স্বাস্থ্য, প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা ও জীবনধারা বিষয়ক আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য পেতে আমাদের ফলো করুন।
Follow foe more