বিলুপ্তির দ্বার থেকে ফিরছে উড়তে না পারা বিরল তোতা ‘কাকাপো’

পৃথিবীর একমাত্র উড়তে না পারা তোতা পাখি ‘কাকাপো’ বিলুপ্তির মুখ থেকে ধীরে ধীরে ফিরে আসছে। দীর্ঘদিন ধরে আশঙ্কা ছিল—অতিরিক্ত ওজন, ধীর গতি এবং শিকারিদের কাছে সহজ শিকার হয়ে পড়ার কারণে এই বিরল পাখিটি হয়তো টিকে থাকতে পারবে না। তবে কয়েক দশকের নিবিড় সংরক্ষণ প্রচেষ্টায় এখন আশার আলো দেখা যাচ্ছে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক ইনডিপেনডেন্ট জানিয়েছে, নিউজিল্যান্ডের সংরক্ষণবিদেরা তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে কাকাপো রক্ষায় কাজ করছেন। একসময় এদের সংখ্যা নেমে এসেছিল মাত্র ৫০–এ। বর্তমানে সেই সংখ্যা বেড়ে ২০০–এর বেশি হয়েছে, যা জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।

চলতি বছর পরিস্থিতি আরও আশাব্যঞ্জক। কাকাপোর প্রিয় রিমু গাছের ফল প্রচুর পরিমাণে ধরায় এদের মধ্যে প্রজনন প্রবণতা বেড়েছে। সংরক্ষণকর্মীরা রেকর্ডসংখ্যক ছানা জন্মের প্রত্যাশা করছেন। এতে ভবিষ্যতে এদের সংখ্যা আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

বর্তমানে কাকাপো দক্ষিণ নিউজিল্যান্ড উপকূলের তিনটি ছোট ও দূরবর্তী দ্বীপে সীমাবদ্ধ। বনে এদের দেখা পাওয়া অত্যন্ত বিরল। সম্প্রতি ‘রাকিউরা’ নামে ২৩ বছর বয়সী একটি কাকাপো সামাজিক মাধ্যমে আলোচনায় আসে। ‘হেনুয়া হু’ দ্বীপে তার ভূগর্ভস্থ বাসা থেকে লাইভস্ট্রিমে ডিমে তা দেওয়ার দৃশ্য সম্প্রচারিত হয়। সে তিনটি ডিম পেড়েছে, যার দুটি নিষিক্ত।

প্রজাতিটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সংরক্ষণকর্মীরা ডিমগুলো সাময়িকভাবে কৃত্রিম ডিম দিয়ে বদলে নিরাপদে ইনকিউবেটরে রেখেছেন। ফুটবার ঠিক আগে সেগুলো আবার বাসায় ফিরিয়ে দেওয়া হবে—এটি এখন কাকাপো সংরক্ষণের একটি নিয়মিত কৌশল।

কাকাপো আকারে ছোট বিড়ালের মতো এবং ওজন তিন কেজিরও বেশি হতে পারে। প্যাঁচার মতো মুখ এবং সবুজ-হলুদ-কালো ছোপযুক্ত পালকের কারণে এরা বনের পরিবেশে সহজে লুকিয়ে থাকতে পারে। এদের একটি তীব্র কিন্তু মিষ্টি গন্ধ রয়েছে, যা অতীতে শিকারিদের কাছে তাদের অবস্থান ফাঁস করে দিত।

মানুষ শত শত বছর আগে নিউজিল্যান্ডে আসার পর ইঁদুর, কুকুর, বিড়াল ও স্টোটের মতো প্রাণীর আগমন এবং বন উজাড়ের ফলে কাকাপো প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যায়। ১৯৭৪ সালে এদের অস্তিত্ব নিয়েই সন্দেহ দেখা দেয়। পরে নতুন একটি ছোট দল আবিষ্কৃত হলে পুনরুদ্ধার কার্যক্রম শুরু হয়।
কাকাপোর প্রজনন প্রক্রিয়াও বেশ অদ্ভুত। দুই থেকে চার বছর অন্তর রিমু গাছে প্রচুর ফল ধরলে তারা বংশবিস্তার করে। পুরুষ পাখি মাটিতে গর্ত করে গভীর ‘বুমিং’ শব্দ তোলে, যা দূর থেকে স্ত্রী পাখিদের আকর্ষণ করে। স্ত্রী পাখি একাই ডিমে তা দিয়ে ছানা লালন-পালন করে।

নিউজিল্যান্ডে পাখি জাতীয় পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই কাকাপো ও কিউইয়ের মতো বিরল পাখি রক্ষাকে দেশটির অনেকেই জাতীয় দায়িত্ব মনে করেন। সংরক্ষণ প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলে বিলুপ্তির মুখ থেকে কাকাপোর পুরোপুরি ফিরে আসার আশা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

FAQs

১. কাকাপো কেন উড়তে পারে না?

কাকাপো একটি স্থলচর তোতা পাখি। বিবর্তনের ধারায় এদের ডানা দুর্বল হয়ে গেছে এবং শরীর ভারী হওয়ায় তারা উড়তে সক্ষম নয়।

২. কাকাপো কোথায় পাওয়া যায়?

বর্তমানে কাকাপো শুধু নিউজিল্যান্ডের কয়েকটি দূরবর্তী সংরক্ষিত দ্বীপে সীমিত আকারে পাওয়া যায়।

৩. কাকাপো কেন বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়েছিল?

মানুষের আগমনের পর ইঁদুর, বিড়াল, কুকুর ও স্টোটের মতো শিকারি প্রাণীর আক্রমণ এবং বন উজাড়ের কারণে এদের সংখ্যা দ্রুত কমে যায়।

৪. বর্তমানে কাকাপোর সংখ্যা কত?

সংরক্ষণ প্রচেষ্টার ফলে কাকাপোর সংখ্যা এখন ২০০–এর বেশি হয়েছে, যা আগে প্রায় ৫০–এ নেমে গিয়েছিল।

৫. কাকাপো সংরক্ষণে কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে?

ডিম ইনকিউবেটরে রাখা, শিকারি নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ দ্বীপে স্থানান্তর এবং নিবিড় পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে কাকাপো সংরক্ষণ করা হচ্ছে।

Follow for more