শুষ্ক মৌসুমে যখন বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলো পানিশূন্য হয়ে পড়ে, কৃষি ও পরিবেশের ওপর নেমে আসে সংকট। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকার পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। দীর্ঘ ছয় দশকের আলোচনার পর বাস্তবায়নের পথে এগোতে থাকা এই প্রকল্পকে কেউ দেখছেন দেশের পানি নিরাপত্তার নতুন দিগন্ত হিসেবে, আবার কেউ দেখছেন সম্ভাব্য পরিবেশগত চ্যালেঞ্জের উৎস হিসেবে।
ব্যারেজ (Barrage) হলো নদীর ওপর নির্মিত এমন একটি কাঠামো, যার মাধ্যমে নদীর পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ, সংরক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিতরণ করা হয়। মূলত পদ্মা নদীর উপর নির্মাণ করে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মার পানি ধরে রাখা, যাতে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোতে পর্যাপ্ত মিঠা পানি সরবরাহ করা যায়, কৃষিতে সেচ দেওয়া যায় এবং লবণাক্ততা কমানো সম্ভব হয়।
প্রাথমিকভাবে প্র্রকল্প প্রস্তাবের নথি অনুসারে, রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার পদ্মা নদীতে ২ দশমিক ১ কিলোমিটার মূল বাঁধ নির্মাণ করা হবে। এতে থাকবে ৭৮টি পানিনিষ্কাশন কপাট (স্পিলওয়ে), ১৮টি তলদেশ নির্গমন পথ (আন্ডার স্লুইস) ও দুটি ফিশ পাস বা মাছ চলাচলের জায়গা।
প্রকল্পটি তৈরি করা হবে সরকারি অর্থায়নে(GoB Fund)। প্রথম ধাপের ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩৪,৪৯৭ কোটি টাকা । সম্ভাব্য বাস্তবায়নকাল জুলাই ২০২৬ থেকে জুন ২০৩৩।
পদ্মা ব্যারেজ থেকে কী কী সুবিধা আসবে?
সরকার দাবি করছে এ বাঁধের মাধ্যমে ২৯০ কোটি ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা যাবে । সংরক্ষিত পানি দিয়ে পাঁচটি নদীর পানিপ্রবাহ পুনরুজ্জীবিত করা হবে। এগুলো হলো হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী নদী। শুষ্ক মৌসুমে এসব নদীতে প্রায় ৮০০ কিউসেক মিটার পানি সরবরাহ করা হবে।
এছাড়াও প্রকল্পের নথি বলছে, বৃহত্তর কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, বরিশাল, পাবনা ও রাজশাহী অঞ্চলের চাষযোগ্য প্রায় ২৯ লাখ হেক্টর কৃষি জমিতে প্রয়োজনীয় সেচের পানি সরবরাহ করা যাবে। এতে প্রায় ২৩.৯ লাখ টন ধানের ও ২ দশমিক ৩৪ লাখ টন মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির প্রত্যাশা করা হচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বছরে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়ার প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
প্রকল্পের আওতায় একটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। সম্ভাব্য উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ১১৩ মেগাওয়াট
প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় প্রায় ৯ লাখেরও বেশি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে ও বিপুল সংখ্যক শ্রমঘণ্টা (man-days) তৈরি হবে।
তবে প্রকল্পটি নিয়ে কিছু উদ্বেগও রয়েছে। বিশেষ করে নদীতে পলি জমা, পরিবেশগত প্রভাব, উচ্চ নির্মাণ ব্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের একাংশ। তাদের মতে, প্রকল্পের সম্ভাব্য সুফল ও ঝুঁকি সম্পর্কে আরও বিস্তৃত গবেষণা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত মূল্যায়ন প্রয়োজন।
পদ্মার বুকে নির্মিত হতে যাওয়া এই ব্যারেজ বাংলাদেশের জন্য এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। এটি যেমন কৃষি, নদী ও অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের আশা জাগায়, তেমনি সামনে আনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জও। এখন দেখার বিষয়, বহু প্রতীক্ষিত এই প্রকল্প দেশের পানি নিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে কি না। সময়ই তার উত্তর দেবে।
FAQs
Q1. পদ্মা ব্যারেজ কি?
Ans: পদ্মা নদীর ওপর নির্মিত এমন একটি কাঠামো, যার মাধ্যমে নদীর পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ, সংরক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিতরণ করা হয়।
Q2. পদ্মা ব্যারেজ কোথায় নির্মাণ করা হচ্ছে?
Ans: রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার পদ্মা নদীতে ২ দশমিক ১ কিলোমিটার মূল বাঁধ নির্মাণ করা হবে।
Q3.পদ্মা ব্যারেজের খরচ কত ধরা হয়েছে?
Ans: প্রথম ধাপের ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩৪,৪৯৭ কোটি টাকা ।