তুলি তার বাবার সাথে গতকাল রাতে পার্কে ঘুরতে গিয়েছিল। সেখানে সে লক্ষ্য করল, সৌন্দর্য বর্ধনকারী গাছগুলোকে কৃত্রিম আলোকমালা বা মরিচ বাতি দিয়ে সাজানো হয়েছে। এই দৃশ্যটি যেমন শান্তিপূর্ণ ছিল, তেমনি তুলির মনে একটি নতুন ভাবনার উদয় হলো—যদি এই আলোকিত গাছগুলো নিজেরাই জোনাকির মতো স্নিগ্ধ নরম আলো তৈরি করতে পারত, তবে কেমন হতো?
এটি শুনতে অদ্ভুত মনে হলেও, আধুনিক জিন প্রকৌশল (Genetic Engineering)-এর কল্যাণে তুলির এই কল্পনা এখন বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। ল্যাবে তৈরি হচ্ছে এমন উদ্ভিদ, যা অন্ধকারে প্রাকৃতিকভাবেই জ্বলজ্বল করে।
আলোকিত গাছ বা স্ব-আলোকিত উদ্ভিদ আবিষ্কারের ইতিহাস
আলোকিত গাছ বা বায়োলুমিনেসেন্ট উদ্ভিদের উদ্ভাবনের যাত্রা শুরু হয় কয়েক বছর আগে। এই প্রযুক্তির মূল মাইলফলকগুলো নিচে দেওয়া হলো:
- রাশিয়ার গবেষণা: ২০২০ সালে ‘Russian Academy of Sciences’ এবং ‘Planta LLC’-এর বিজ্ঞানীরা সর্বপ্রথম ‘self-luminous tobacco plant’ বা স্ব-আলোকিত তামাক গাছ তৈরি করে বিশ্বজুড়ে সাড়া ফেলেন।
- MagicPen Bio-এর অবদান: এরপর ‘MagicPen Bio’ নামক গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি নতুন করে উদ্ভাবনের পথ দেখায়। তারা কিছু সুপরিচিত সৌন্দর্য বর্ধনকারী গাছ, যেমন- মল্লিকা বা সূর্যমুখী উদ্ভিদের কোষে জিনগত পরিবর্তন ঘটায়।
- প্রযুক্তির প্রয়োগ: তারা সর্বপ্রথম ‘Nicotiana benthamiana’ নামে একটি আলোকিত তামাক গাছ তৈরিতে সক্ষম হন। গবেষণায় দেখা গেছে, তারা এই উদ্ভিদে দুই ধরনের বায়োলুমিনেসেন্ট জিন ব্যবহার করেছেন—কিছু জোনাকি পোকার এবং কিছু আলোকিত ছত্রাক বা মাশরুমের।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আলোকিত গাছ ‘Firefly Petunia’-এর উত্থান
জিন প্রকৌশলের এই দৌড়ে যুক্তরাষ্ট্রও পিছিয়ে নেই। ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ‘Light Bio’ প্রতিষ্ঠান বাণিজ্যিকভাবে ‘Firefly Petunia’ নামে আলোকিত গাছ বাজারে আনে।
তবে এখানে একটি মজার বিষয় লক্ষ্যণীয়: যদিও গাছটির নামকরণে ‘Firefly’ বা জোনাকি পোকার উল্লেখ রয়েছে, কিন্তু বাস্তবে এতে জোনাকির কোনো জিন ব্যবহার করা হয়নি। এর পরিবর্তে এতে ‘Neonothopanus nambi’-এর মতো আলোকিত ছত্রাকের বায়োলুমিনেসেন্ট জিন ব্যবহার করা হয়েছে।
আলোকিত গাছ তৈরির মূল লক্ষ্যসমূহ
বিজ্ঞানীরা এই প্রযুক্তি উদ্ভাবনের পেছনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন:
- ১. নাইট গার্ডেন: রাতের বেলাও বাগানের স্নিগ্ধ সৌন্দর্য উপভোগ করার সুযোগ তৈরি করা।
- ২. ল্যান্ডস্কেপ ডিজাইন: পার্ক, আবাসিক এলাকা, ক্যাম্পাস বা শহরের সৌন্দর্য বাড়াতে গাছপালা দিয়ে নান্দনিক আলোকসজ্জা তৈরি করা।
- ৩. পর্যটন পার্ক: পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে আকর্ষণীয় আলোকায়নের ব্যবস্থা করা।
- ৪. ইকো-লাইটিং: পরিবেশবান্ধব এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী আলোর বিকল্প উৎস হিসেবে একে ব্যবহার করা।
- ৫. অলংকারিক গাছের বাজার: ইনডোর প্ল্যান্ট হিসেবে ঘর, অফিস, হোটেল বা উপহার হিসেবে এই গাছের বাণিজ্যিক চাহিদা মেটানো।
জীবন্ত সেন্সর (Living Sensor) হিসেবে উদ্ভিদের ব্যবহার
আলোকিত গাছের নিজস্ব আলো তৈরির এই বৈশিষ্ট্যকে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘জীবন্ত সেন্সর’ বলা হয়। এটি কেবল সৌন্দর্যের জন্য নয়, বরং গাছের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণেও ব্যবহৃত হতে পারে। যেমন:
- গাছটি কোনো রোগে আক্রান্ত কি না, তা বোঝা যায়।
- গাছের পানির অভাব হচ্ছে কি না, তা শনাক্ত করা যায়।
- বিষাক্ত রাসায়নিক বা ক্ষতিকারক কীটপতঙ্গের সংস্পর্শে এলে গাছটি সতর্কবার্তা দিতে পারে।
উপসংহার
একসময় মানুষ অন্ধকার দূর করতে আগুন আবিষ্কার করেছিল, পরে এসেছে বৈদ্যুতিক বাতি। এখন বিজ্ঞানীরা এমন এক ভবিষ্যতের কল্পনা করছেন, যেখানে প্রকৃতিই হতে পারে আলোর উৎস। যদিও সেই বাস্তবতা এখনো অনেক দূরে এবং প্রযুক্তিটি প্রাথমিক স্তরে রয়েছে, তবুও আলোকিত গাছের গবেষণা আমাদের মনে একটি নতুন প্রশ্ন জাগিয়ে তোলে—প্রকৃতির কাছ থেকে আমরা এখনো কত অজানা সম্ভাবনা আবিষ্কার করতে বাকি রেখেছি? তাই বলা যায়, আগামী দিনে পরিবেশবান্ধব আলোকায়নের ক্ষেত্রে এই আলোকিত গাছ এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে।
প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQs)
Q1. আলোকিত গাছ কীভাবে আলো তৈরি করে?
Ans: বিজ্ঞানীরা সাধারণত জোনাকি পোকা বা বিশেষ কিছু ছত্রাকের (যেমন: Neonothopanus nambi) বায়োলুমিনেসেন্ট জিন ব্যবহার করে উদ্ভিদের কোষে জেনেটিক পরিবর্তনের মাধ্যমে এই আলো তৈরি করার সক্ষমতা তৈরি করেন।
Q2. আলোকিত গাছের প্রধান ব্যবহার কী কী?
Ans: নাইট গার্ডেন তৈরি, ল্যান্ডস্কেপ ডিজাইন, পর্যটন পার্ক, পরিবেশবান্ধব আলোকায়ন (Eco-lighting) এবং ইনডোর প্ল্যান্ট হিসেবে ঘর বা অফিসের সৌন্দর্য বর্ধনে এর ব্যবহার রয়েছে। এছাড়া এগুলো জীবন্ত সেন্সর হিসেবেও কাজ করতে পারে।
Q3. এই প্রযুক্তি কি বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে পাওয়া যায়?
Ans: হ্যাঁ, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ‘Light Bio’ প্রতিষ্ঠান বাণিজ্যিকভাবে ‘Firefly Petunia’ নামে এমন একটি আলোকিত গাছ বাজারে আনে।